সকাল থেকে খুব বৃষ্টি আমার এখানে। এখন তো বর্ষা ঋতু চলছে। শুনছি বৃষ্টি নাকি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি গভীর নিম্নচাপের জন্য হচ্ছে, মৌসুমি বায়ুর জন্য নয়। আবহাওয়া দফতর বলছে বৃষ্টি নাকি আগামি ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত চলবে। নিম্নচাপ সরে গেলেও মৌসুমি অক্ষরেখা
থাকবে, ফলে বৃষ্টি চলতে থাকবে। যদিও ব্যাপারটা আমি খুব একটা বুঝিনি!
যাকগে, বৃষ্টি হচ্ছে এটা দেখতে পাচ্ছি, কখনো ইলশেগুঁড়ি, কখনো ঝেঁপে।
এত বৃষ্টি আমার ভালো লাগে না। বিশেষ করে যদি অফিস থাকে বা কোথাও বেরনোর থাকে।
প্রথম তো ছাতা সঙ্গে রাখতে হবে, প্রয়োজনে মাথায় দিতে হবে। ভীষণ বিরক্তিকর ! এর
থেকে ভেজা ভালো। কিন্তু সমস্যা হল বৃষ্টি ভিজে ঠাণ্ডা লেগে যাবার। শুধু কি তাই?
ছাতা না নিলে বাড়ির লোক মাথা খারাপ করে দেবে। যদিও এখানে আমি একা থাকি, তবুও মনে
হয় বাড়ির লোকজন আমাকে সবসময় দেখছে। অবশ্য ভালোর জন্যই বলে! এছাড়া, সবসময়
স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, সূর্য দেখতে পাব না। আকাশের মুখ সবসময় ভার, নীল আকাশ দেখতে
পাইনা। আসলে এই প্রকৃতি, পরিবেশ আমার ওপর খুব প্রভাব ফেলে। এই সব দেখলে মন খারাপ
লাগে। যারা বৃষ্টি ভালোবাসে তাদের দেখলে সত্যি অবাক লাগে! কলকাতায় বর্ষা তো
নোংরামিতে ভরা। রাস্তা পুরো নোংরা, কোথাও কোথাও আবার প্রায় একহাঁটু জল জমে যায়! ওই একহাঁটু জল
পেরিয়ে যেতে গেলেই তো জীবন শেষ হয়ে যায় আমার! ওই জলের ওপর আবার নোংরা ভাসছে, ইয়াক!
আর বলতে ভালো লাগছে না !
তবে এই বর্ষার একটা ভালো দিক আছে। সেটা হল খাওয়া দাওয়া। দুপুরবেলা খিচুড়ি,
বিকেলবেলা চপ মুড়ি সঙ্গে একটু কফি আর আড্ডা। পুরো জমে যাবে। রাত্রে ফ্যান চালিয়ে
চাদর গায়ে ঘুম। স্বর্গ সুখ ! অনেক ভুমিকা হয়েছে। এবার আসি আমার পছন্দের খাবার
খিচুড়িতে। খিচুড়ি খেতে আমার বর্ষার প্রয়োজন হয় না। আমি প্রায়ই খাই।। কারণ অনেক
পুষ্টি আর সহজে বানানো যায়। চাল, ডাল, আর অনেক রকম সব্জি সহযোগে একটা সম্পূর্ণ
প্রস্তুত খাবার। সপ্তাহে প্রায় তিন রকমের খিচুড়ি খাই। চালের, ডালিয়ার, ওটসের (oats)। উপকরণ সব একই শুধু বিভিন্নতা চাল ডালিয়া আর ওটসের (oats)। অঞ্চলভেদে এর রুপের বৈচিত্র্য দেখা যায়। সোজা কথায় যে
যার ইচ্ছে মত বানায়। যেমন নরম খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি, মাংস খিচুড়ি, নিরামিষ খিচুড়ি
ইত্যাদি। শুধু রুপে নয় উচ্চারনেও এর বৈচিত্র্য, “ড়“ কখনো “র” হয়ে যায়। এই খিচুড়ি
কিন্তু ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ছাড়াও দক্ষিন এশিয়ার দেশ গুলতে অত্যন্ত জনপ্রিয়
খাবার।
ধরা হয় খিচুড়ি শব্দটি একটি সংস্কৃত শব্দ খিচ্চা (Khicca) থেকে এসেছে। যার মানে হল চাল, ডাল দিয়ে
তৈরি একটি খাবার। এর ইতিহাসটা খুব মজার। মানে, এর ইতিহাস পড়তে পড়তে আপনি
মধ্যযুগে পৌঁছে যাবেন টাইম মেশিন ছাড়াই। গ্রিক দূত সেলুকাস, মরক্কোর বিখ্যাত
পর্যটক ইবনে বতুতা, রাশিয়ান পর্যটক আফনাসিই
নিকতিন খিচুড়ির কথা উল্লেখ করে গেছেন
তাদের লেখাতে। শুধু কি তাই চাণক্যের লেখাতেও মানে মৌর্যযুগে চন্দ্রগুপ্তের
রান্নাঘরেও খিচুড়ির খোঁজ পাওয়া যায়। মুঘলদের রান্নাঘরেও এর উপস্থিতির প্রমাণ মেলে।
আকবরের মন্ত্রী ও ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরিতে বিভিন্ন রকমের খিচুড়ির কথা
লিখেছেন। জাহাঙ্গীরের
প্রিয় বিশেষ ধরনের খিচু়ড়ি তৈরি করা হতো পেস্তা, কিসমিস
দিয়ে, জাহাঙ্গীর
নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’। মানে, নামেও বৈচিত্র্য। সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রিয় “আলমগিরি খিচুড়ি”-তে
চাল, ডালের সঙ্গে মেশানো হত বিভিন্ন প্রকার মাছ ও ডিম। এরপর রাজকীয় সম্মান মেলে হায়দ্রাবাদের নিজামের রান্নাঘরে।
আরও মজার ব্যাপার হল, উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে দেশে ফেরত ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর
কর্মচারীদের হাত ধরে খিচুড়ির ইংল্যান্ডে
প্রবেশ।মানে, ব্রিটিশদের রান্নাঘরেও খিচুড়ির উপস্থিতি জ্বলজ্বল করছে । শুধু কি তাই, জনপ্রিয়
খাবার হিসাবে সকালের খাবারের টেবিলে জায়গা
করে নিয়েছে।
বর্ষা, বাঙালি আর খিচুড়ি মধ্যে একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক দেখা যায়। বাঙালির
বর্ষাকালে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা থাকবেই। অবশ্য যাঁদের ইলিশের বিলাসিতা নেই,
তাঁরা বিভিন্ন রকম ভাজা-ভুজি (আলু, বেগুন, ডিম, অন্য কোন মাছ যার দাম ইলিশের থেকে
কম ইত্যাদি ভাজা), তরকারি সহযোগে খিচুড়ি সুখ ভোগ করেন। আমার অবশ্য এত ভাজা-ভুজির
শখ নেই (আমার আলস্যের কারণেই এই ত্যাগ), শুধু খিচুড়িতেই খুশি। বাঙালির
ঘরে খিচুড়ি নিয়ে নানা রকমের পরিক্ষা-নিরীক্ষা চলে ৷ কখনও মাংস দিয়ে, কখনও মাছ
দিয়ে বা কখনও সবজি সহযোগে৷ বাঙালির তালিকায় রয়েছে, মুগ ডালের খিচুড়ি, সবজি
খিচুড়ি, মুসুর ডালের খিচুড়ি, গমের
খিচুড়ি, সাবুর খিচুড়ি, মাংসের
খিচুড়ি, ডিমের খিচুড়ি, মাছের
খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি। বাঙালির
ঠাকুর ঘরে (ভোগ হিসাবে), উপবাসেও (সাবুদানা খিচুড়ি) খিচুড়ির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বাঙালির শব্দ ভাণ্ডারে
“জগাখিচুড়ি” বলে একটা শব্দ আছে। পুরীর জগন্নাথ
দেবের মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের নিত্যদিন খিচুড়িই লোকমুখে সংক্ষেপে হয়েছে ‘জগাখিচুড়ি’। আর বাঙালীর কথ্যরীতিতে এটা তালগোল পাকানোর প্রতিশব্দ হিসেবে পরিণত হয়েছে। এক কথায় খিচুড়ি হল একটি
আন্তর্জাতিক খাবার যার উৎপত্তি অখণ্ড ভারতবর্ষে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে সবার
রান্নাঘরে জায়গা করে নেয় ও জনপ্রিয় হয়।
| চিত্র ঋণ :pramitasrecipestore.blogspot.com |
2 মন্তব্যসমূহ
Very very good... Dola
উত্তরমুছুনCarry on..
Onek information pelam kichudi niye.. Carry on
উত্তরমুছুনআপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে !