Ticker

6/recent/ticker-posts

মহালয়া


মহালয়া বলতে যেটা প্রথমে মনে আসে তা হল, ভোর চারটায় কোনরকমে ঘুম থেকে উঠে রেডিওতে আকাশবাণী কলকাতা ক চ্যানেল অন করা। আমার মনে হয় এটা সব বাঙালির ক্ষেত্রে একই ঘটনা। অবশ্য এফএম এর দৌলতে ওটা ভোর চারটা নাহলেও ভোর পাঁচটায় সবাই রেডিও অন করবেই, তা সে কিছুক্ষন শোনার পর ঘুমিয়ে পড়ুক বা না পড়ুক।

মহালয়া মানে যে বাঙালির দুর্গোৎসবের শুরু সেটা তো আগে থেকে জানতামই। কিন্তু গতকাল মহালয়া সম্পর্কে গুগল কাকীমাকে জানতে চাওয়াতে বেশ কিছু মজার তথ্য জানলাম। আগেই বলে রাখি এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায় কিছুটা আমার ওপরে থাকলেও, যারা ইন্টারনেটে তথ্য গুলো সার্বজনীন করেন তাদের দায় কিন্তু অনেকটাই। আমার পক্ষে  যতটা সম্ভব, আমি তথ্য এর সত্যতা যাচাই করে দেবার চেষ্টা করছি।

শুনতে অবাক লাগলেও, মহালয়ার সাথে দুর্গাপুজোর সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই। এই দিন প্রতিমার চোখ আঁকার রেওয়াজেরও কোনো নিয়ম নেই। সনাতন ধর্ম অনুসারে, এইদিন প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যলোকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রয়াত আত্মাদের এই সমাবেশকে মহালয় বলে আর এই মহালয় থেকেই এসেছে মহালয়া। এটি পিতৃপক্ষের শেষ দিন।

এখন প্রশ্ন হল, পিতৃপক্ষ কি? আর প্রয়াত আত্মাদের কেনোই বা মর্ত্যে পাঠানো হয়? হিন্দুধর্ম মতে, পিতৃপক্ষ হল, পূর্বপুরুষের তর্পণ এর জন্য বিশেষ এক পক্ষ। তর্পণ শব্দটি এসেছে "ত্রূপ" থেকে, যার অর্থ হল "সন্তুষ্ট করা"ঈশ্বর, হৃষি ও পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে জল নিবেদন করে সন্তুষ্ট করাই হল তর্পণ করা। পিতৃপক্ষের সূচনা হয় ভদ্র পূর্ণিমাতে( দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা) আর সমাপ্তি ঘটে মহালয়া অমাবস্যা বা মহালয়ার দিন। উত্তর ভারত ও নেপালে ভাদ্রের পরিবর্তে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

হিন্দু মহাকাব্য অনুযায়ী, সূর্য, কন্যা রাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষের সূচনা হয়। তবে লোক মুখে এটা শোনা যায় যে ওই সময় পূর্বপুরুষেরা পিতৃলোক (স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে কোনো একটা জায়গা যেখানে যমরাজ  শাসন করেন) ছেড়ে মর্ত্যলোকে নিজের উত্তরপুরুষের বাড়িতে থাকতে আসেন। এরপর সূর্য বৃশ্চিক রাশি তে প্রবেশ করলে,তাঁরা আবার পিতৃলোক ফিরে যান। ষোলো দিন ধরে পিতৃপক্ষ উদযাপন করা হয়। 

মহাভারত অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণের মৃত্যুর পর, উনি স্বর্গে গেলে, স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসাবে দেয়া হয়। তখন কর্ণ, ইন্দ্রকে (পাঠান্তরে, ইন্দ্রের পরিবর্তে যম) এর কারণ জানতে চাইলে, ইন্দ্র জানান, উনি(কর্ণ) সারা জীবন শক্তির আরাধনা করে গেছেন। পূর্বপুরুষের কথা তিনি কখন স্মরণ করেননি এবং প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মাকে কোনোদিন খাদ্য - পানীয় দেননি।তাই পূণ্য ফলে স্বর্গে আসতে পারলেও খাদ্য - পানীয় পাবার যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হননি। উত্তরে কর্ণ জানান, এই ব্যাপারে তিনি নির্দোষ। কারণ জন্মের পর তাঁর মা তাঁকে ত্যাগ করেন। সূত বংশজাত অধিরত ও তাঁর স্ত্রী তাঁকে প্রতিপালন করেন। তারপর দূর্যোধন তাঁকে আশ্রয় দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগের দিন একে একে শ্রীকৃষ্ণ এবং মাতা কুন্তী এসে জন্ম ও বংশের পরিচয় দেন। তারপর যুদ্ধ শুরু হয় এবং ষোলো সতেরো দিন পর তিনি মারা জান। তাই  তিনি পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা বা খাদ্য - পানীয় দেবার সময় পাননি।  এই পরিস্থিতি থেকে কর্ণকে উদ্ধারের বিধান হিসাবে, ষোলো দিনের জন্য মর্তে গিয়ে পিতৃগনের উদেশ্যে অন্ন ও জল প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপ্রতিপাদ তিথি তে আবার মর্তে ফিরে আসেন এবং এক পক্ষ কাল থেকে পিতৃপুরুষ কে তিল- জল দান করেন। আশ্বিনের অমাবস্যা তিথিতে শেষ জল দান করে স্বর্গে ফিরে যান। এই বিশেষ পক্ষকালই পিতৃপক্ষ।

তবে আজকের বাঙালি জীবনে মহালয়ার দিন থেকেই দুর্গাপুজোর আরম্ভ হয়ে যায়। Whatsapp এ শুভ মহালয়ার সাথে সাথে, শুভ শারদীয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ও শুরু হয়ে যায়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী,এই দিন  দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে আবির্ভূতা হন। হতে পারে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ - বাণীকুমারের গীতি আলেখ্যটি মহালয়ার দিন চালানোর ফলেই এই ধারণার সূত্রপাত। তবে আকাশবাণীর অনুষ্ঠানটির নাম “মহিষাসুরমর্দিনী”, মহলায়া কিন্তু না। যদিও অনুষ্ঠানটি এখন সম্প্রচারিত হয় মহালয়ার দিন, তবে আগে ষষ্ঠীর ভোরেই সম্প্রচারিত হত।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। দুর্গাপুজো তার মধ্যে অন্যতম পার্বণ। দুর্গাপুজো যদি মহালায়াতে শুরু না হয়ে, তারও আগে শুরু হত, তাহলেও অবাক হবার মত কিছু নেই। কারণ, বাঙালির শুধু একটা অজুহাত লাগে কোন উৎসবের জন্য। প্রসঙ্গত, থিমের পুজো আর বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে মহালায়ার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজো। অনেকেই প্রশ্ন করেন, মহালায়ার দিন কি আদৌ “শুভ”? তাদের জন্য বলি, আপনারা ওই প্রশ্নেই আটকে থাকুন। আমরা হুল্লোড়ে জাতি, বাঙালিরা, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল উদ্বোধন করে ফেলেছি মহালায়ার দিন। দলে দলে এসে ভিড় জমান। শুভ মহালায়া এবং শুভ শারদীয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা নেবেন। ভালো থাকবেন।

তর্পণ
চিত্র ঋণ :
sentinelassam.com






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে !